
মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় তিন ফসলি কৃষি জমি থেকে অবৈধভাবে মাটি কাটার মহোৎসব চলছে। দিন-রাত সমানতালে মাটি দস্যু সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকলেও রাতের অভিযানে নিরাপত্তার ঝুঁকি দেখছে স্থানীয় প্রশাসন। ফলে দিনের বেলায় ‘লোক দেখানো’ অভিযান চললেও থামছে না ফসলি জমি ধ্বংসের এই প্রক্রিয়া। এতে ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয় কৃষক ও সাধারণ মানুষ।
ঘিওর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. তানভীর ইসলাম জানান, “রাতের অভিযানে নিরাপত্তার ঝুঁকি রয়েছে। রাতের মাটি কাটার বিষয়টি নিয়মিত মামলা হওয়া সবচেয়ে ভালো। দিনের বেলায় মাটি কাটলে আমরা গিয়ে ধরে নিয়ে আসবো।”
তবে প্রশাসনের এই অবস্থানের সুযোগ নিয়ে মাটি দস্যুরা রাতেই তাদের কার্যক্রমকে বেশি জোরদার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে ও স্থানীয়রা জানায়যায়, বানিয়াজুরী ইউনিয়নের বাক বানিয়াজুরী মৌজা, বালিয়াখোড়া ইউনিয়নের পুকুরিয়া মৌজা এবং দোতরা এলাকায় এসবিআই ইটভাটা ও স্টোন ব্রিকসকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী মাটি খেকো চক্র। ভেকু ও ট্রাক ব্যবহার করে আবাদি জমির বুক চিরে মাটি নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় কৃষকদের দাবি, চক্রটি প্রভাবশালী হওয়ায় তারা প্রতিবাদ করতে সাহস পান না।
জোকা এলাকার কয়েকজন কৃষক বলেন, “আমাদের কৃষি জমি নষ্ট করে গভীর গর্ত করা হচ্ছে। এর ফলে পাশের জমিও ভেঙে পড়ছে। রাতে মাটিবাহী ট্রাক যাতায়াতের জন্য আমাদের জমির ওপর দিয়ে রাস্তা বানাতে বাধ্য করা হচ্ছে।”
ক্ষোভ প্রকাশ করে এক কৃষাণী বলেন, “এই জমিই আমাদের জীবন। রাতের অন্ধকারে মাটি কেটে আমাদের ভবিষ্যৎ শেষ করে দিচ্ছে। দিনের অভিযান আমাদের কোনো কাজে আসছে না।”
অনুসন্ধানে মাটি উত্তোলনের অভিযোগে বালিয়াখোড়া ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি মোশাররফ হোসেন নিলু ও আওয়ামী লীগ সমর্থক রমজানের নাম উঠে এসেছে।
তবে, মোশাররফ হোসেন নিলু অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি মাটি ব্যবসার সাথে জড়িত নই, কেবল কোম্পানির জায়গা কিনে ভরাট করি।”
অন্যদিকে রমজান জানান, তিনি কেবল মিডিয়া হিসেবে কাজ করেছেন।
পুকুরিয়া এলাকায় স্টোন ব্রিকসে মাটি সরবরাহকারী ব্যবসায়ী মনির এ বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। এসবিআই ইটভাটার মালিকের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
বালিয়াখোড়া ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা মো. লুৎফর রহমান বলেন, “মাটি ব্যবসায়ীদের জেল দেওয়া দরকার। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”
বানিয়াজুরী ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা ইদ্রিস প্রামাণিক জানান, তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
গত ২১ এপ্রিল বিকেলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তানভীর ইসলামের নেতৃত্বে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতে তিনজনকে আটক করে ৪ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। তবে স্থানীয়দের মতে, এই জরিমানা সিন্ডিকেটের কাছে নস্যি। তাদের দাবি, দীর্ঘমেয়াদী সমাধান না হলে ঘিওরের উর্বর কৃষি জমি অচিরেই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে এবং এলাকায় দীর্ঘমেয়াদী জলাবদ্ধতা ও বেকারত্ব সৃষ্টি হবে।
কৃষি জমি রক্ষায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ভূমি মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।
Leave a Reply